তারক ঘোষ যুদ্ধক্ষেত্রে সকলেই সশস্ত্র। তারা সৈনিক। নিজের নিজের দেশের জন্য তারা জীবনপণ করে লড়বেন। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই মৃত্যুভূমি যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিটি ঘটনা যারা আপনার টিভির পর্দায় বা খবরের কাগজের পাতায় তুলে ধরছেন, তারা কিন্তু নিরস্ত্র। টিভির সামনে বসে চা খেতে খেতে আপনি যখন কোনো চিত্র সাংবাদিকের তোলা ভয়ঙ্কর যুদ্ধের খণ্ডচিত্র গুলো দেখছেন আর আলোচনা করছেন, সেই চিত্রসাংবাদিক তখন গুলির আঘাতে মৃত্যুর সময় গুনছেন। একজন সোইনিক তবু গুলি চালিয়ে শত্রু নিধন করতে পারবেন, নিদেনপক্ষে আত্মরক্ষা করার চেষ্টাটাও করতে পারবেন, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের এই নিরস্ত্র ‘সৈনিকেরা’ শুধু পালন করে যাবেন তাদের কর্তব্য। হাতে মেশিওগান নয়, কলম আর কাঁধে মর্টার নয়, ক্যামেরা।
আজ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য আমরা প্রতি মুহুর্তে দেখছি। আমরা জানি, এটা সাংবাদিকের কর্তব্য। দেহে প্রাণ থাকা পর্যন্ত যেমন একজন সৈনিক যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাবেন না, ঠিক তেমনি, একজন সাংবাদিক। খবর সংগ্রহের জন্য গুলি খেতেও প্রস্তুত। এক সাংবাদিক ইউনিয়নের মতে, রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে দেশটিতে অন্তত ২৩ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছে। সাংবাদিকদের সুরক্ষা কমিটি বলছে, সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অন্তত সাতটি মৃত্যু হয়েছে। ফটোগ্রাফার মাকসিম লেভিন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউক্রেনে নিহত ৬ষ্ঠ সাংবাদিক। তিনি ২০১৩ সাল থেকে ইউক্রেন থেকে রয়টার্সকে ফটো এবং ভিডিও সরবরাহ করেছেন। ইউক্রেনীয় সরকার জানিয়েছিল, ইউক্রেনীয় ফটোসাংবাদিক এবং ভিডিওগ্রাফার মাকসিম লেভিনকে শেষবার দেখা যাওয়ার দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পরে কিয়েভের কাছে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মিঃ লেভিনের মৃত্যুর কথা শুনে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্ট বলেছিল যে তারা "গভীরভাবে মর্মাহত"।
আর একটি ঘটনা গতকালের। আবার আক্রান্ত রয়টার্সের চিত্রসাংবাদিকদ্বয়। তবে, গুলির আঘাত পেয়েও তারা কোনোরকমে বেঁচে গেছেন। ভর্তি আছেন হাসপাতালে। মারা গেছেন তাদের গাড়ির চালক। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবাদকর্মী বহনকারী একটি গাড়ি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় শহর সেভেরোদোনেৎস্কের দিকে যাওয়ার সময় গুলিতে হতাহতের এই ঘটনা ঘটে। কিয়েভ থেকে পিছু হটার পর পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চল দখলে রুশ বাহিনী যে অভিযান চালাচ্ছে, এর মধ্যে সেভেরোদোনেৎস্কে লড়াই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
রয়টার্স জানিয়েছে, তাদের আলোকচিত্রী আলেকজান্ডার এরমোশেঙ্কো ও ক্যামেরাম্যান পাভেল ক্লিমভ রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনী থেকে সরবরাহ করা একটি গাড়িতে যাচ্ছিলেন। সেভেরোদোনেৎস্কের ১০ কিলোমিটার উত্তরে রুবিজনিয়া শহরের মধ্যবর্তী সড়কে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত অংশে ভ্রমণের সময় হামলার মুখে পড়েন। আহত আলেকজান্ডার এরমোশেঙ্কো ও পাভেল ক্লিমভকে রুবিজনিয়ার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তীক্ষ্ণ ধাতববস্তুর আঘাতে আলোকচিত্রী আলেকজান্ডারের ছোট ক্ষত ও ক্যামেরাম্যান পাভেল ক্লিমভের হাতে ফ্র্যাকচার হয়েছে। গুলিতে নিহত চালকের পরিচয় তাৎক্ষণিক নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। রুবিজনিয়া শহরের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সংগ্রহে রয়টার্সের এই সংবাদকর্মীদের জন্য এই চালক ঠিক করে দিয়েছিলেন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। এ ঘটনা নিয়ে মন্তব্য জানতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাড়া পায়নি রয়টার্স।


No comments:
Post a Comment